কোটা বাতিলের আন্দোলন
সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। একই সময়ে সরকারের চালু করা সর্বজনীন পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে রয়েছেন দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরাও। বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকারের দুটি পৃথক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম থমকে গেছে। কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে বুধবার দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এর আগের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদযাত্রা কর্মসূচি, জাহাঙ্গীরনগর ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে।
১৯৭২ সাল থেকে সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা চালু থাকলেও ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তা সংস্কারের দাবিতে চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের অহিংস আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এ আন্দোলনের উত্তাপ ক্রমেই বাড়তে দেখা যায়। সেসময় সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র প্রাধান্য পায় কোটা সংস্কারবিষয়ক আলোচনা। শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন ও অবস্থান কর্মসূচির কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে ওই বছরের ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সব কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। ফলে সে বছরের অক্টোবরে সরকারি চাকরিতে নবম থেকে ১৩তম গ্রেডে (যেসব পদ আগে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি বলে পরিচিত ছিল) নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ জুন সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড) মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলসংক্রান্ত পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। বস্তুত এর পরই পুনরায় বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দানা বাঁধে।
এ বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই যে, একটা সময় পর্যন্ত জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি ও নারীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরিতে কোটা পদ্ধতির প্রয়োজন ছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বের সর্বত্র এখন মেধাকে দেওয়া হয় সর্বাধিক গুরুত্ব। আমাদের দেশেও প্রশাসনসহ সরকারি কর্মকাণ্ডে দক্ষতা বাড়াতে মেধার প্রতি গুরুত্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই। চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসানেও এর প্রয়োজন। সংবিধানের ১৯(১), ২৯(১) ও ২৯(২) অনুচ্ছেদে চাকরির ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে। আবার এটিও সত্য, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য সংবিধানে কোটার বিষয়ে বলা রয়েছে।
আমরা মনে করি, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই এ বিষয়টির সুরাহা করা দরকার। এটা তো ঠিক, চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সরকার বা কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়। তাদের আন্দোলন অধিকারের প্রশ্নে। তাই এসব দাবি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। আবার এটাও ভুলে গেলে চলবে না, আন্দোলনের নামে নৈরাজ্যের অপসংস্কৃতি নিন্দনীয় ও অপরাধযোগ্য। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতেই পরিস্থিতির সুরাহা হবে, এটাই প্রত্যাশা।

No comments:
Post a Comment